কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬ এ ০১:৩০ PM
কন্টেন্ট: পাতা
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি
দেশের বিদ্যুৎ খাতে দক্ষতা, জবাবদিহিতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদ্যুৎ খাত সংস্কারের আওতায় গঠিত ‘বিদ্যুৎ খাত পুনর্গঠন সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপ’-এর সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ তারিখে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পূর্বতন: পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (পিজিসিবি)) প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তীতে, কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে ২১ নভেম্বর ১৯৯৬ তারিখে প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়।
জাতীয় গ্রিড সঞ্চালন ব্যবস্থাপনায় একটি স্বতন্ত্র ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতায় ৩১ ডিসেম্বর ২০০২ তারিখ হতে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর নিকট থেকে সমগ্র জাতীয় গ্রিড নেটওয়ার্কের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরবর্তীতে দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার একমাত্র রাষ্ট্রীয় সঞ্চালন সংস্থা হিসেবে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ও বৃহৎ শিল্প গ্রাহকের সংযোগস্থল পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদভাবে সঞ্চালন করে থাকে। জাতীয় গ্রিড নেটওয়ার্ক মূলত ৪০০ কেভি, ২৩০ কেভি ও ১৩২ কেভি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সঞ্চালন লাইন এবং গ্রিড উপকেন্দ্রসমূহের সমন্বয়ে গঠিত। এ সেবা প্রদানের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কর্তৃক নির্ধারিত হারে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা/কোম্পানির নিকট থেকে ‘হুইলিং চার্জ’ গ্রহণ করে থাকে।
জাতীয় গ্রিডের নিরবচ্ছিন্ন, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিচালনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পাওয়ার গ্রিড নিয়মিতভাবে সঞ্চালন লাইন, গ্রিড উপকেন্দ্র, ট্রান্সফরমার, সুইচগিয়ার, প্রটেকশন ও কন্ট্রোল সিস্টেমসহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম সম্পাদন করে থাকে। একই সঙ্গে সঞ্চালন ব্যবস্থার সক্ষমতা, স্থিতিশীলতা ও নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সংস্কার, পুনর্বাসন, আপগ্রেডেশন ও আধুনিকায়ন কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করা হয়।
দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংযোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংযুক্তি এবং আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় সঞ্চালন নেটওয়ার্কের সক্ষমতা ও পরিধি বৃদ্ধির লক্ষ্যে পাওয়ার গ্রিড বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে থাকে। এর আওতায় নতুন সঞ্চালন লাইন ও গ্রিড উপকেন্দ্র নির্মাণ, বিদ্যমান নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভোল্টেজ লেভেল উন্নীতকরণ এবং জাতীয় ও আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো সম্প্রসারণ অন্তর্ভুক্ত।
এসব কার্যক্রমের ভিত্তি হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী সঞ্চালন পরিকল্পনা প্রণয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার পূর্বাভাস বিশ্লেষণ, পাওয়ার সিস্টেম স্টাডি, প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই এবং মানসম্মত প্রকৌশল নকশা প্রণয়ন করা হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে জাতীয় সঞ্চালন নেটওয়ার্কের পরিকল্পিত সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন ও ভবিষ্যৎ চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সক্ষমতা উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে।
জাতীয় গ্রিডের নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিচালনার জন্য পাওয়ার গ্রিডের অধীন জাতীয় লোড ডিসপ্যাচ সেন্টার (NLDC) আধুনিক SCADA, টেলিকমিউনিকেশন ও অন্যান্য গ্রিড মনিটরিং ও কন্ট্রোল ব্যবস্থার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক রিয়েল-টাইম সিস্টেম অপারেশন পরিচালনা করে থাকে। উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে তাৎক্ষণিক সমন্বয়, সঞ্চালন নেটওয়ার্কের অবস্থা পর্যবেক্ষণ, বিদ্যুৎ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং সিস্টেমের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এ কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
এছাড়া জাতীয় গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুইচইয়ার্ড, গ্রিড উপকেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট ৩৩ কেভি ফিডারসমূহের রিলে প্রটেকশন সিস্টেমের যথাযথ কো-অর্ডিনেশন ও সমন্বয় নিশ্চিত করা হয়। এর মাধ্যমে ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত ত্রুটিপূর্ণ অংশ বিচ্ছিন্ন করে বৃহত্তর গ্রিডকে সুরক্ষিত রাখা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঝুঁকি হ্রাস করা হয়।
আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা ও আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে পাওয়ার গ্রিড আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট গ্রিড সংযোগ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এর মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানি ও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে আন্তঃসংযোগ জোরদার করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ, সুরক্ষা, টেলিমেট্রি, ভয়েস ও ডেটা যোগাযোগের জন্য পাওয়ার গ্রিডের বিস্তৃত অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এ নেটওয়ার্কের অতিরিক্ত সক্ষমতা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি রাজস্ব আয় করে থাকে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর NTTN Licensing Guidelines অনুসরণ করে পাওয়ার গ্রিড বিভিন্ন টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল অপারেটরের নিকট ‘কোর-কিলোমিটার’ ভিত্তিতে অপটিক্যাল ডার্ক ফাইবার লিজ প্রদান করে থাকে। এ কার্যক্রমের আওতায় BTCL, Fiber@Home Limited, Summit Communications Limited, Bahon Limited এবং মোবাইল অপারেটর Teletalk, Banglalink, Grameenphone ও Robi-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ডার্ক ফাইবার ব্যবহারের সুযোগ প্রদান করা হয়েছে।
এছাড়া, সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমে সহায়তার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)-এর অধীন ‘BDREN Trust’-কে ব্যান্ডউইথ ট্রান্সমিশন ব্যাকবোন হিসেবে পাওয়ার গ্রিডের ডার্ক ফাইবার নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সুযোগ প্রদান করা হয়েছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা-সংক্রান্ত কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সেবা প্রদানও পাওয়ার গ্রিডের অন্যতম কার্যক্রম। নাগরিক সনদ (Citizen Charter)-এ নির্ধারিত সেবার পরিধি ও মূল্য অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠানটি সঞ্চালন সংযোগ, কারিগরি পরামর্শ, তথ্য ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক সেবা প্রদান করে থাকে।
সামগ্রিকভাবে, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগসূত্র হিসেবে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি জাতীয় সঞ্চালন নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা, উন্নয়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, স্থিতিশীলতা ও সক্ষমতা নিশ্চিতকরণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছে।